বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া (১৯৪৫-২০২৫) নারী নেতৃত্বের এক অগ্রগামী হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন। সাধারণ বিধবা থেকে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসীন নেতা হিসেবে উঠে আসা এই নেত্রী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের ক্ষমতায়নের পথ সুগম করেছেন।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী নেতা হন। তিনবারের মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬-এর সংক্ষিপ্তকালীন এবং ২০০১-২০০৬) তাঁর সরকার নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০০৫ সালে তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থান দিয়েছে।
রাজনৈতিক যাত্রা ও নেতৃত্ব
একজন সাধারণ বিধবা গৃহবধু থেকে রাজনীতির মাঠে ওঠা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮১ সালে স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যার পর। বিএনপির সাধারণ সদস্য থেকে ১৯৮২ সালে সহ-চেয়ারপারসন ও ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন হয়ে তিনি দলকে একত্রিত করেন এবং সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।
১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে খালেদা জিয়ার উত্থান পিতৃতান্ত্রিক রাজনীতিতে নারীদের প্রবেশের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের দ্বারা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো লিঙ্গভিত্তিক আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়নের যুগান্তকারী পদক্ষেপ
খালেদা জিয়ার সরকার নারীদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
১৯৯৪ সালে মহিলা মাধ্যমিক ছাত্রী সহায়তা কর্মসূচি চালু হয়ে গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষাকে বিনামূল্যে করে।
প্রাথমিক শিক্ষা সহায়তা ও খাদ্য-অনুপ্রেরণা কর্মসূচি মেয়েদের জন্য স্থায়ী খাদ্য ও সহায়তা নিশ্চিত করে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে নারীদের জন্য কোটা চালু করে মেয়েদের ভর্তি বৃদ্ধি করা হয়।
প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-১৯৯৫) প্রাথমিক ও দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা বিনামূল্যে করা হয়।
এই সব উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মডেল হিসেবে স্বীকৃত, যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে নারীর শিক্ষার উন্নয়নে অনুকরণীয় উদাহরণ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য, আইনি সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন
স্বাস্থ্য খাতে, দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-২০০৬) মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং মাতৃমৃত্যু হ্রাসে কার্যকর কর্মসূচি চালু করা হয়। নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়; ধর্ষণ, অ্যাসিড হামলা ও দেনমোহরের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রবর্তন করা হয়।
নির্যাতিত নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া ১৯৯৫ সালে বেগম রোকেয়া পদক প্রবর্তন করে নারীদের অবদান স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসন ৩০ থেকে ৫০-এ বৃদ্ধি করা হয়।
অর্থনৈতিকভাবে, তাঁর সরকার রেডি-মেড গার্মেন্টস (আরএমজি) খাত সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রথম মেয়াদে প্রায় দুই লাখ নারীকে কর্মসংস্থান প্রদান করে। নিম্নআয়ের নারীদের জন্য মাইক্রোক্রেডিট কর্মসূচি এবং বিশেষ তহবিল চালু করা হয়। চট্টগ্রামে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন প্রতিষ্ঠা ও ১০০ একর জমি প্রদান তাঁর নারী ক্ষমতায়ন পরিকল্পনার অংশ ছিল।
পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অন্তর্ভুক্তি পুনরুজ্জীবিত হয় এবং কম্পিউটার সাক্ষরতা ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে হাজারো নারীকে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয়।
ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
নারীবাদী বিশ্লেষকরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার অবদান সত্ত্বেও বাংলাদেশের নারী আন্দোলনে তাঁর নাম যথাযথভাবে স্থান পায়নি, যা রাজনৈতিক পক্ষপাতের ফল। সরকারের দুর্নীতিমুক্তি তুলনায় কম হলেও, লিঙ্গভিত্তিক হয়রানি—যেমন “বীরাঙ্গনা” শব্দের অপব্যবহার—তাঁর উত্তরাধিকারকে ছাপিয়েছে।
তবু, তাঁর নেতৃত্ব নারীদের জন্য গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। তাঁর জীবন ও কর্ম শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং নারী ক্ষমতায়নের পথিকৃৎ হিসেবে দেশের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অবদান
২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় ২৯তম স্থান।
নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি-নির্ধারণে প্রভাবশালী ভূমিকা।
উন্নয়নশীল দেশে নারীর শিক্ষার ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রসারে উদাহরণ স্থাপন।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক কীর্তি বাংলাদেশের নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস।
| ফজর | ৪:০৯ - ৫:২৮ ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১১:৫৯ - ৪:৩১ দুপুর |
| আছর | ৪:৩২ - ৬:২৫ বিকাল |
| মাগরিব | ৬:২৭ - ৭:৪৫ সন্ধ্যা |
| এশা | ৭:৪৬ - ৪:০৮ রাত |
| জুম্মা | ১.৪০ মিনিট দুপুর |