চট্টগ্রামের চিকিৎসক দম্পতির কোল আলো করে আসা সন্তানের হাত ধরে রচিত হলো ধোঁকাবাজির এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। চট্টগ্রাম নগরের আন্দরকিল্লা কেন্দ্রিক দুটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্র হাঙ্গেরির ভুয়া ভিসা দিয়ে লুটে নিয়েছে নিরীহ মানুষদের কোটি কোটি টাকা। অভিভাবক ও স্বজনদের নৈতিক শিক্ষার সব আদর্শকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাতা এই চক্রান্তের মরণফাঁদে পা দিয়ে স্বপ্ন ও সহায়-সম্বল হারিয়ে আজ পথবসা দেশের অর্ধশত পরিবার।ইউরোপের সম্ভাবনাময় দেশ হাঙ্গেরিতে নামীদামি প্রতিষ্ঠানে আকর্ষণীয় বেতনে কাজের সুযোগ—এমনই চটকদার বিজ্ঞাপনের পেছনে ছিল চরম এক প্রতারণার জাল। ‘ডিয়াজ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ ও ‘পায়োনিয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুই নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে এই জাল পেতেছিলেন চট্টগ্রামভিত্তিক চিকিৎসকের সন্তান দেবায়ন চক্রবর্তী ও তাঁর সিন্ডিকেট। অভিবাসনের আন্তর্জাতিক সব প্রক্রিয়া পার করার নামে ব্যাংকিং চ্যানেল ও আইনি চুক্তির মতো বিশ্বস্ত হাতিয়ার ব্যবহার করেছিল তারা। কিন্তু আন্তর্জাতিক সূত্রে যাচাই করার পর বেরিয়ে এসেছে কঠোর সত্য—সরবরাহ করা হাঙ্গেরির প্রতিটি ওয়ার্ক পারমিটই ছিল শতভাগ ভুয়া।
আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের ঝলমলে বাতি আর ইউরোপের রাজপথে হেঁটে বেড়ানোর যে স্বপ্ন বুকে বেঁধেছিল তরুণেরা, তা আজ চট্টগ্রাম থেকে বগুড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা অসহায় পরিবারগুলোর জন্য চরম এক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
অবৈধ মানবপাচারকারীরা সাধারণত সমুদ্র বা গহীন জঙ্গল বেছে নিলেও, এই চক্রটি মানুষের আস্থা অর্জনে বেছে নিয়েছিল দেশের প্রচলিত আইনি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থা। ২১ জন ভুক্তভোগী তরুণের প্রতিনিধি মো. সাইফুদ্দিন মামুন যখন প্রধান অভিযুক্ত দেবায়নের সঙ্গে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সই করেন, তখন কারও সন্দেহ করার সুযোগ ছিল না। চুক্তিতে প্রতি ভিসার প্রসেসিং ফি ধরা হয়েছিল ৮০ হাজার টাকা।
২০২৪ সালের শেষলগ্ন থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ব্র্যাক ব্যাংকের আন্দরকিল্লা শাখা ও অনলাইন আরটিজিএস (RTGS)-এর মাধ্যমে ২০টিরও বেশি কিস্তিতে আসামিদের অ্যাকাউন্টে তুলে দেওয়া হয় ৫৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিনিময়ে দেওয়া হয়েছিল প্রতিষ্ঠানের প্যাডে মানি রিসিট। কিন্তু সেই মানি রিসিট আর স্ট্যাম্প চুক্তি যে কেবলই কাগজ কেটে তৈরি ফাঁদ ছিল, তা বুঝতে ভুক্তভোগীদের লেগে যায় দীর্ঘ সময়।
এই চক্রান্তের শিকড় কেবল চট্টগ্রাম নগরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; চক্রটি ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন জেলায়। বগুড়া ওভারসীজের রাজুর কাছ থেকে ৪০ লাখ, মরতুজার ২০ লাখ, শামীমের ২৬ লাখ, শাহ রিয়াজের ১৬ লাখ টাকাসহ অন্যান্য ভুক্তভোগীদের জমানো সঞ্চয় মিলিয়ে মোট ১ কোটি ৬৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায় চক্রটি।
নিঃস্ব হওয়া সাইফুদ্দিন মামুন যখন পাওনা টাকার দাবিতে আন্দরকিল্লায় হাজির হন, তখন ভালোবাসার বদলে জোটে সন্ত্রাসী বাহিনীর অপহরণ ও প্রাণনাশের সরাসরি হুমকি। শেষমেশ চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেন ভুক্তভোগী। পরবর্তীতে অন্য এক চেকের মামলায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাই ফেরত দেবায়নকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এসে সেই একই আসামি পুনরায় দেশত্যাগের পাঁয়তারা করছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
চিকিৎসক দম্পতির সন্তান দেবায়ন চক্রবর্তী যখন তাঁর বাবা ডা. পঞ্চানন চক্রবর্তী, মা ডা. সীমা ভট্টাচার্য এবং চেয়ারম্যান শেখ আজিম আল সাত্তার, বাপ্পা চৌধুরী ও জয়িতা চক্রবর্তীকে নিয়ে এই অসাধু সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। যদিও দেবায়নের মা-বাবা দাবি করেছেন, চার বছর ধরে তাঁর সঙ্গে তাঁদের কোনো পারিবারিক সম্পর্ক নেই এবং ছেলের যেকোনো শাস্তিতে তাঁদের আপত্তি নেই। এদিকে সাবেক সিআইডি তদন্ত কর্মকর্তা(উপ-পরিদর্শক) মো. আব্দুল করিম বলেন, অনুসন্ধানে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।
জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিসের (বিএমইটি) স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, লাইসেন্সহীন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈদেশিক লেনদেন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
অন্যদিকে মানবাধিকারনেতা অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. ওবায়দুল করিম মনে করেন, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিবারের পরিচয় ভাঙিয়ে করা এই অপরাধগুলো দেশের সার্বিক অভিবাসন খাতের ওপর মারাত্মক আঘাত হানে। চক্রটির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দ্রুত বিচার হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তারা।